বেলুচিস্তানের এক রুক্ষ ও দুর্গম পাহাড়। চারিদিকে টানা চার বছর ধরে অবরোধ করে রেখেছে হাজার হাজার সজ্জিত ব্রিটিশ সেনা। চার-চারটি বছর অতিবাহিত হয়ে গেল, সাম্রাজ্যবাদী বাহিনীর কোনো চক্রান্তই সেই পাহাড়ে কাজ করছে না। এই চার বছরে প্রায় তিরাশি জন ব্রিটিশ সৈন্য প্রাণ হারাল। ব্রিটিশ বাহিনীর মনে বদ্ধমূল ধারণা—পাহাড়ের সেই গভীর ও দুর্গম কোন্দরে নিশ্চয়ই কোনো বিরাট ও সুসংগঠিত মুজাহিদিন বাহিনী আত্মগোপন করে আছে!
অবরোধ, নির্যাতন এবং একটি অদম্য লড়াই
কয়েক হাজার প্রশিক্ষিত ও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ব্রিটিশ সৈন্য কেবল ভয়েই সেই পাহাড়ের নিকট ভিড়তে সাহস পাচ্ছিল না। পাহাড়কে অবরুদ্ধ করে তারা আশেপাশের নিরপরাধ বসতিগুলোর ওপর চড়া হারে ট্যাক্স ধার্য করল, স্থানীয় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করল যেন তারা মুজাহিদদের ধরিয়ে দেয়। কিন্তু দিন যায়, মাস যায়... কোনো কাজই হলো না। গ্রামবাসীরা নিজেদের রক্ত দিলেও বীর সন্তানদের বিশ্বাসঘাতকতা করেনি।
পাহাড় চূড়ার অবিশ্বাস্য সত্য
অবশেষে প্রায় চার বছর পর, বিশাল লশকর ও সামরিক বহর নিয়ে ব্রিটিশ বাহিনী পাহাড়ে এক চড়াও অভিযান চালাল। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সেনারা চরম সতর্কতায় পাহাড় চূড়ায় পৌঁছাল। কিন্তু চূড়ায় পৌঁছে যা দেখল, তাতে তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল!
কোথায় বিশাল মুজাহিদ বাহিনী? কোথায় হাজার হাজার যোদ্ধা? পুরো পাহাড়জুড়ে অবস্থান করছিলেন মাত্র তিনজন মুজাহিদ! দীর্ঘ চার বছর ধরে লড়াই করতে করতে শেষপর্যন্ত তাঁদের রসদ ও বুলেট শেষ হয়ে গিয়েছিল। কোনো আক্রমণ চালাতে না পেরে তাঁরা খালি হাতে পাহাড়ে অবস্থান করছিলেন—তবুও আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা ওড়াননি!
ইতিহাসের সেই তিন অমর বীর:
- ফকির কালা খান (Faqir Kala Khan)
- জালাম্ব খান (Jalamb Khan)
- রহিম আলী খান রহিমাহুল্লাহ (Rahim Ali Khan)
উন্নাসিক ব্রিটিশ শাসকদল ক্ষমতার দম্ভে এই তিন অকুতোভয় বীরকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছিল।
আমরা কি তাঁদের চিনি?
তাদের কি আপনারা কখনো চিনেছেন, পড়েছেন, বুঝেছেন, জেনেছেন কিংবা শুনেছেন? তাঁদের এই অসীম সাহসিকতা ও ত্যাগের ইতিহাস কি আমাদের পাঠ্যবই বা আলোচনায় স্থান পেয়েছে?
যাঁরা রাজপ্রাসাদ, আধুনিক অস্ত্র আর বিশাল ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে মাত্র ৩ জন হয়েও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভীত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের ইতিহাস আজ ধূলিমলিন হতে বসেছে। আজ সময় এসেছে নিজেদের শিকড়কে চেনার, সত্য ইতিহাসকে জানার এবং ফকির কালা খান, জালাম্ব খান ও রহিম আলী খান (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতো বিস্মৃত বীরদের স্মরণ করার।
আমাদের কি তাঁদের পড়তে হবে না? আমাদের কি তাঁদের জানতে হবে না?
0 Comments