বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করার পর পুরো মুসলিম জাহান যখন উল্লাস ও বিজয় উৎসবে মেতে উঠেছিল, ঠিক তখনই সেনাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (রহিমাহুল্লাহ) বসে ছিলেন এক গভীর ভাবনায়। বিজয়ের আনন্দচ্ছটার মাঝেও তাঁর চেহারায় ফুটে উঠেছিল চরম হতাশা ও উদ্বেগের ছাপ।
তাঁর এই চিন্তিত থাকার কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি যে ঐতিহাসিক উত্তরটি দিয়েছিলেন, তা আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিরাট সতর্কতা। তিনি বললেন:
গোপন গোয়েন্দা বিভাগ ও আলেমবেশীদের সন্ধান
আফসোস, সুলতানের সেই দূরদর্শী বার্তার গুরুত্ব তখন অনেকেই অনুধাবন করতে পারেনি। পরিস্থিতি অনুধাবন করে তিনি নিজের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সৈন্যদের নিয়ে গোপনে এক নতুন গোয়েন্দা বিভাগ গঠন করলেন। আটককৃত শত্রু গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই বাহিনীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো।
ফিলিস্তিনের সেই বিখ্যাত 'ইমাম'-এর ঘটনা
সে সময় ফিলিস্তিনে এক বিখ্যাত 'ইমাম' ও শেখের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত, পরহেজগার এবং ইসলামী জ্ঞানে বিদগ্ধ আলেম হিসেবে সুপরিচিত। সবাই তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
একদিন তিনি তাঁর মসজিদে তাফসীর পেশ করছিলেন। এমন সময় দুইজন অপরিচিত আগন্তুক ভেতরে প্রবেশ করে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তাঁর আলোচনা শুনল। তাফসীর শেষে সবাই চলে গেলে আগন্তুকরা ইমামের কাছে গিয়ে কিছু অদ্ভুত প্রশ্ন করল—
— "সূর্য কখন ওঠে?"
ইমাম উত্তর দিলেন, "যখন বৃষ্টি থেমে যায়।"
— "বৃষ্টি কোন দিক থেকে আসে?"
ইমাম জবাব দিলেন, "ঝড়ো হাওয়া যেদিক দিয়ে আসে।"
সাধারণ মুসল্লিরা এসব সাংকেতিক প্রশ্নের অর্থ না বুঝলেও ইমাম সাহেব তাদের চিনে ফেললেন। সবাইকে বিদায় দিয়ে তিনি অত্যন্ত আদরের সাথে আগন্তুকদের নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। আর ঘরে প্রবেশ করতেই ইমামের স্ত্রী অতিথিদের সামনে মদ পরিবেশন করলেন!
ভেতরের কক্ষে বসে শুরু হলো গোপন আলাপ। ইমাম সাহেব আগ্রহের সাথে বলতে লাগলেন কিভাবে তিনি এতদিন ধরে মানুষের ঈমানে চিড় ধরাচ্ছেন, কীভাবে মাসআলাগত সূক্ষ্ম বিরোধ তৈরি করে মুসলিম সমাজে ফিতনা ছড়াচ্ছেন এবং মানুষদের জিহাদ ও সত্য থেকে দূরে সরিয়ে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর কাজে ব্যস্ত রাখছেন।
ঠিক তখনই সেই দুই আগন্তুক মাথার পাগড়ি ও ওপরের জামা খুলে ফেললেন। জানা গেল, তাঁরা অন্য কেউ নন—সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (রহ.)-এর সেই গোপন গোয়েন্দা বিভাগের দুর্ধর্ষ অফিসার! সত্য উন্মোচিত হতেই ভণ্ড ইমাম ক্ষমা চেয়ে চিল্লাতে লাগল, কিন্তু অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হলো।
ইতিহাসের পাঠ ও বর্তমান বাস্তবতা
ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, শত্রুপক্ষ থেকে ভারী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মুসলিম সমাজে রূপ disguise ধারণ করে ফিতনা ছড়ানোর অপরাধে এবং ছদ্মবেশী শত্রু হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পর বহু ভণ্ড আলেমরূপী শত্রুকে প্রতিহত করা হয়েছিল। যাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল সাধারণ মুসলিমদের ঈমান ধ্বংস করা ও উম্মাহর মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা।
চিন্তা করুন তো একবার!
হাজার বছর পূর্বে ইসলামী খেলাফতের যুগে যদি ধর্মীয় পোশাকে শত্রুর দালালরা এভাবে আলেম ও শেখ সেজে সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে, তবে বর্তমান সময়ে সেই ষড়যন্ত্রের মাত্রা কতটুকু হতে পারে?
আজও দেশের আনাচে-কানাচে এমন অনেক রূপধারী দেখা যায়, যারা গোপনে বা প্রকাশ্যে সাম্রাজ্যবাদী, ক্রুসেডার কিংবা ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে। সংবাদমাধ্যমেও মাঝে মাঝেই এদের আসল রূপ উন্মোচিত হয়।
আমাদের করণীয় কি?
সময় থাকতে প্রতিটি মুসলিমকে সচেতন হতে হবে। নিজেদের দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করতে হবে, সঠিক ইতিহাস জানতে হবে এবং কুরআন-সুন্নাহর সঠিক বোঝাপড়া অর্জন করতে হবে। তবেই আমরা সহজে চিনতে পারব—কে হকের পথে আছে আর কে ছদ্মবেশী দালাল হিসেবে কাজ করছে।
আসুন, আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে ইলম ও দূরদর্শিতা দিয়ে নিজেদের ঈমান ও উম্মাহকে রক্ষা করি!
0 Comments