আমি এক বিধ্বস্ত অতীতের ধ্বংসাবশেষ

হারানো গৌরব, মেধার আত্মবলিদান এবং উম্মাহর আত্মপরিচয় খোঁজার হাহাকার

আমি এক বিধ্বস্ত অতীতের ধ্বংসাবশেষ। আমি হারিয়েছি কর্ডোভাকে, আমি হারিয়েছি আলহামরাকে! গৌরবের সেই লালকেল্লা হতে আমার হেলালি নিশান আজ ধূলিমলিন হয়ে গেছে। আমার প্রথম কেবলা আল-আকসা আজ নরপিশাচদের ভয়াল থাবায় রক্তাক্ত।

আমার শিশিলি আমিরাত, ক্রিট আমিরাত, ইন্দোনেশিয়ার দারুল ইসলাম সালতানাত, বুখারার আমিরাত, ক্রিমিয়া খানাত কিংবা ডারফুর শহর—সবই আজকে আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। আমার হাত কেবলই রিক্ত। কী বলি রিক্ত? এক অসীম শূন্যতা ভর করেছে আমার বক্ষজুড়ে!

ইস্তাম্বুল ছাড়া আমার হাতে আজ আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু সেই ইস্তাম্বুল হাতে থেকেও যেন লক্ষ-কোটি আলোকবর্তিকা দূরের কোনো অভ্যন্তরীণ রেষারেষির অনাদরে নিভে যাচ্ছে। বাবরি মসজিদ ভাঙার সাবলের প্রতিটি আঘাত আমার বক্ষগহ্বরে এসে লেগেছে। জ্ঞানব্যাপী কাশি হতে হালের আদিনা—সবখানে আমি কেবলই বিধ্বস্ত!

"ভগ্নপ্রায় আমার অতীত আজ এগোচ্ছে বিলুপ্তির দিকে। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমি শতধায় বিভক্ত! 'জোরে আমিন' নাকি 'আস্তে আমিন'—এসব নিয়ে মারামারিতে লিপ্ত আমরা।"

যে মেধা ও উদারতার ইতিহাস আমরা ভুলে গেছি

আমাকে দেখে কি আজ কেউ বিশ্বাস করবে—একসময় আমার দরবারে কোনো বই অনুবাদ করলে অনুবাদকারীকে সেই বইয়ের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা উপহার দান করতাম? আমাকে দেখে কি মনে হয়, আমাদেরই অভিভাবকত্বে হুনাইন ইবনে সাবিত, হুনাইন ইবনে ইসহাক ও সাবিত ইবনে কুর্রার মতো শ্রেষ্ঠ অমুসলিম পণ্ডিতদের প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল?

হাজার হাজার ইহুদি ও খ্রিস্টান অনুবাদক ও চিকিৎসক আমাদের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে বড় হয়েছেন, মানুষ হয়েছেন। আমাদের বাগদাদে আশ্রয় না পেলে ইতিহাসে হয়তো তাঁদের নাম ও ঠিকানাটুকুও টিকত না! আমাদের মেধা নিয়ে কথা বলতে গেলে ফুপিয়ে কাঁদলেও কম বলা হবে।

অভাবনীয় প্রযুক্তি ও জ্ঞান চর্চার নিদর্শন:

  • মসজিদ ও নিখুঁত স্থাপত্য: জিপিএস বা স্যাটেলাইটের এই যুগে এসেও এক হাজার বছর আগে নির্মিত আমাদের মসজিদগুলোর কিবলার দিক হিসাব করলে এক সেন্টিমিটারের বিচ্যুতিও পাওয়া যায় না!
  • বাইতুল হিকমার ট্র্যাজেডি: হালাকু খানের নির্দেশে যখন আমাদের 'হাউস অফ উইজডম' (বাইতুল হিকমা)-এর কিতাব টাইগ্রিস নদীতে ফেলে দেওয়া হলো, তখন বইয়ের কালিতে টাইগ্রিস নদীর পানি কালো হয়ে গিয়েছিল।
  • শিক্ষার প্রসার: যখন ইউরোপের রাজারা নিজের নামটুকুও লিখতে পারত না, তখন আমাদের এমন কোনো ঘর ছিল না যেখানে লাইব্রেরি ছিল না। সাধারণ কৃষক পর্যন্ত ছিল শিক্ষিত।
  • পরিচ্ছন্নতা ও সভ্যতা: যখন আমরা দিনে পাঁচবার হাত-মুখ ধুয়ে পাক হতাম, সরকারি হাম্মামখানা বানাতাম—তখন ইউরোপীয়রা গোসলের উপকারিতাই জানত না! কর্ডোবার রাস্তায় যখন বাতি জ্বলত, তার শতবছর পর পর্যন্ত লন্ডন বা প্যারিসের রাস্তা অন্ধকারে কাদার মধ্যে ডুবে থাকত।

আধুনিক বিজ্ঞান ও 'অ্যালগরিদম'-এর প্রকৃত রূপকার কারা?

আজকে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস সবই পশ্চিমা ভাবধারায় আচ্ছন্ন। নিজেদের শত্রুর চোখ দিয়ে, পশ্চিমা চশমা দিয়ে আমরা নিজেদের দেখছি। কথায় কথায় বিরোধীরা তোপ দাগিয়ে বলে—"মুসলমানরা কেন ইহুদি-খ্রিস্টানদের বানানো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে? বিজ্ঞানে তো মুসলমানদের কোনো অবদান নেই!"

কিন্তু তারা কি এটা চিন্তা করে—আজকের স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া (Facebook, Google, YouTube, TikTok) যা কিছু চলছে, তার মূলে রয়েছে জটিল সব অ্যালগরিদম (Algorithm)?

সেই অ্যালগরিদমের জনক কে? কার নাম অনুসারে এই 'অ্যালগরিদম' শব্দের উৎপত্তি? তিনি আর কেউ নন—মুসলিম গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি! আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পুরো ভিত্তিটাই দাঁড়িয়ে আছে যার আবিষ্কারের ওপর, তাকে ও তার জাতিকে আজ ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

"আমাদের নিজেদের চিনতে দেওয়া হচ্ছে না। বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক হীনমন্য ও সংকটপূর্ণ জাতি, যারা জানে না তারা কোথা থেকে এসেছে আর কাদের তারা উত্তরসূরি!"

লজ্জা কি লাগে না আমাদের?

আমরা কি ইতিহাস পড়ব না? আমরা কি নিজেদের মেধা ও অতীতকে জানব না? হীনমন্যতা ঝেড়ে ফেলে আমাদের আবার পড়তে হবে মুসলিম মেধার আত্মবলিদান ও গৌরবের ইতিহাস!