মসজিদুল আকসা হাতছাড়া, আমি কীভাবে হাসি?

সুলতান সালাহউদ্দিন আল আইয়ুবি (রহ.)-এর না হাসার পেছনের করুণ ইতিহাস ও অকৃত্রিম ভালোবাসা

সুলতান সালাহউদ্দিন আল আইয়ুবি (রহিমাহুল্লাহ)-এর শাসনকালে প্রজা ও সাধারণ মানুষের মনে একটি চাপা অভিযোগ ছিল। তাঁরা প্রায়শই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতেন—আমরা এমন এক সুলতান পেলাম, যিনি কখনোই হাসিমুখে কথা বলেন না! তাঁর চেহারায় সব সময় এক গভীর বিষাদের ছাপ থাকে এবং তিনি কেবল গম্ভীর হয়ে চিন্তায় নিমগ্ন থাকেন।

একপর্যায়ে এই অভিযোগ ও অসন্তোষ এত তীব্র রূপ নিল যে, জুমার খুতবায় ইমাম সাহেব প্রজাদের মনের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। খুতবার মিম্বারে দাঁড়িয়ে তিনি হাসিমুখে কথা বলার ইসলামী ফজিলত বর্ণনা করলেন এবং স্পষ্ট ভাষায় বললেন, "যে শাসক নিজের প্রজাদের সাথে হাসিমুখে আচরণ করে না, সে তাদের কাছ থেকে ভালোবাসা ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে না।"

খুতবার পরের সেই ঐতিহাসিক সংলাপ

জুমার নামাজ শেষে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (রহ.) অনুধাবন করলেন যে কথাটি হয়তো তাঁকেই লক্ষ্য করে বলা হয়েছে। তিনি ইমাম সাহেবের কাছে গিয়ে বিনয়ের সাথে জানতে চাইলেন, "হুজুর, আপনি মনে হয় আমাকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বললেন?"

সত্য ও ন্যায় বিচারে অটল ইমাম সাহেব বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সাহসিকতার সাথে উত্তর দিলেন, "হ্যাঁ জনাব! আমি আপনাকেই উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলেছি।"

উত্তর শুনে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (রহ.) এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। তিনি কাঁদতে কাঁদতে ইমামকে বললেন:

"হুজুর! বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখান থেকে মিরাজে গিয়েছিলেন, সেই পবিত্র মসজিদুল আকসা আজ ক্রুসেডারদের হাতে বন্দী! হযরত ওমর (রা.)-এর অর্পিত পবিত্র শহর জেরুজালেম আজ কাফেরদের দখলে। এমন পরিস্থিতিতে আমি সালাহউদ্দিন কীভাবে মুখে হাসি ফোটাতে পারি?"

সুলতানের এই বাঁধভাঙা কান্না দেখে উপস্থিত সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। যে মানুষটির মুখে হাসি না দেখে সবাই অভিযোগ তুলছিল, সেই মানুষটির বুকের ভেতর যে কতটা গভীর ক্ষত ও যন্ত্রণা লুকিয়ে ছিল, তা অনুধাবন করে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

আল-আকসার জন্য সব ভোগ-বিলাস বিসর্জন

১. হজ পালনের ইচ্ছা প্রসঙ্গে:
যখন সুলতানকে অনুরোধ করা হলো—"আপনি উম্মাহর জন্য এত কিছু করলেন, এবার অন্তত একবার পবিত্র হজ পালন করে আসুন।"
তখন তিনি ভারাক্রান্ত কণ্ঠে জবাব দিয়েছিলেন: "আমি কীভাবে হজে যাই, যেখানে আমার আল্লাহর আরেকটি ঘর (আল-আকসা) শত্রুদের হাতে বন্দী?"


২. চিকিৎসকের পরামর্শ ও খাবার প্রসঙ্গে:
একবার নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ ও চিন্তায় তাঁর শরীর মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসকরা তাঁর স্বাস্থ্যের চরম অবনতি দেখে অনুরোধ করে বললেন—"সুলতান, আপনার শরীর টিকিয়ে রাখতে একটু পুষ্টিকর খাবার হিসেবে মুরগির মাংস খাওয়া প্রয়োজন।"
সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (রহ.) তৎক্ষণাৎ তা প্রত্যাখ্যান করে ঐতিহাসিক সেই জবাবটি দিয়েছিলেন: "আমি কি এখানে জামাই সাজতে এসেছি? আমি কি জেরুজালেমে জামাই হতে এসেছি যে আমাকে সুস্বাদু খাবার ও মুরগির মাংস খেতে হবে?"

একবার গভীরে চিন্তা করে দেখেছেন?

একটি জাতির মহান শাসক হয়েও যিনি নিজের খাওয়া-দাওয়া, হাসি-খুশি এমনকি ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছিলেন কেবল প্রথম কেবলা পুনরুদ্ধারের চিন্তায়—আপনারা কি চেনেন সেই সালাহউদ্দিন আল আইয়ুবি (রহিমাহুল্লাহ)-কে?

আমাদের আত্মোপলব্ধি

আজকের দিনে আল-আকসার এই করুণ পরিস্থিতিতে আমাদের অনুভূতি কোথায় দাঁড়িয়ে? সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (রহ.)-এর এই ঈমানী ইতিহাস কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং উম্মাহর প্রতিটি সদস্যের আত্মপরিচয় ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলার এক জীবন্ত শিক্ষা!